নিলামে চোখ রাখবেন যে ১০ জনের ওপর

আইপিএল নিয়ে মাতামাতির অন্যতম কারণ টুর্নামেন্টটির নিলাম প্রক্রিয়া। প্রায় দেড় দশক ধরে এই নিলামই চোখের নিমেষে হতদরিদ্র ক্রিকেটারকে বানিয়ে দিয়েছে কোটিপতি, আবার কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আসা অনেক ক্রিকেটারকে ফিরিয়েছে খালি হাতে। আজ ও কাল বেঙ্গালুরুর আইটিসি গার্ডেনিয়া হোটেলে এমন অনেক ভাগ্যবদলের গল্প লেখা হবে। আগামী আইপিএল উপলক্ষে অনুষ্ঠেয় নিলাম যে বাংলাদেশ সময় আজ ১১টা ৩০ মিনিট থেকে শুরু হতে যাচ্ছে এই হোটেলেই! 

এবারের নিলাম নিয়ে মাতামাতিটা অন্যান্য বারের তুলনায় বেশি। চার বছর পর এবার নিলাম হচ্ছে বড়ে কলেবরে, যার কেতাবি নাম ‘মেগা অকশান।’ প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি একরকম নতুন করেই দল গড়বে আজ। প্রতিটি দলকেই অন্তত ১৮ জন খেলোয়াড় নিয়ে স্কোয়াড বানাতে হবে। তাই নিলামে আজ ও কাল হুমড়ি খেয়ে পড়তে হবে সবাইকে। বেশি দল, বেশি খেলোয়াড় আর প্রচুর অর্থের জোগান—সবই বলছে, নিলাম এবার বেশ রোমাঞ্চ নিয়ে হাজির হবে।

কিন্তু এই রোমাঞ্চের সবচেয়ে বড় যোগান দেবেন কোন কোন ক্রিকেটার? নানা মুনির নানা মত শোনা যাচ্ছে এ ব্যাপারে। বাংলাদেশের দর্শকদের আগ্রহ কোন দিকে বেশি থাকবে, তা তো বলে দেওয়াই যায়। সাকিব আল হাসান, মোস্তাফিজুর রহমান, লিটন দাস, তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম এবার নাম লিখিয়েছেন নিলামে। এর বাইরেও আইপিএলের মেগা নিলামে উত্তেজনার পারদ বেশি চড়তে পারে যাঁদের কারণে, তাঁদের নিয়েই এই আয়োজন।

শ্রেয়াস আইয়ার

২৭ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারের কপালটা খারাপই বলতে হয়। দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ এই অধিনায়ক হয়তো এখনও দিল্লির প্রধান তারকা হয়ে থাকতেন, যদি বাঁ কাঁধের চোটটা যন্ত্রণা না করত। এই চোটের কারণেই শ্রেয়াসকে সরিয়ে ঋষভ পন্তকে অধিনায়ক বানায় দিল্লির ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। শ্রেয়াস সুস্থ হওয়ার পরেও পন্তের ওপরেই ভরসা রেখেছে দিল্লি ক্যাপিটালস। এদিকে অধিনায়কত্ব তো দূর, সুস্থ শ্রেয়াসকে এবারের নিলামের আগে দলে ধরেও রাখেনি দিল্লি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই, এবার শ্রেয়াসকে নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে নিলামে।

বিশেষ করে কলকাতা নাইট রাইডার্স, রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু ও পাঞ্জাব কিংসের মতো ‘অধিনায়কের খোঁজে থাকা’ দলগুলো শ্রেয়াসের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে কয়েকগুণ। নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা এক ভিডিওতে সাবেক ভারতীয় ওপেনার বীরেন্দর শেবাগ জানিয়েছেন, এবারের আইপিএলের নিলামে পাঁচজন ভারতীয়কে নিয়ে দলগুলো কাড়াকাড়ি করবে। শার্দুল ঠাকুর, যুজবেন্দ্র চাহাল, শিখর ধাওয়ান ও ঈশান কিষানের পাশাপাশি যে তালিকায় শেবাগ স্থান দিয়েছেন আইয়ারকেও।

দেভাল্ড ব্রেভিস

তাঁকে ডাকা হয় ‘বেবি এবি।’ ১৮ বছর ২৬৮ দিন বয়সী দেভাল্ড ব্রেভিসকে যে দক্ষিণ আফ্রিকান কিংবদন্তি এবি ডি ভিলিয়ার্সেরই খুদে সংস্করণ ভাবা হয়! মোটেও বাগাড়ম্বর নয়, ব্রেভিসের ব্যাটিংয়ের ধরনও ডি ভিলিয়ার্সের ‘কার্বন কপি’—ডাউন দ্য উইকেট এসে কাভার দিয়ে তুলে মারা, স্ট্রেট ড্রাইভ কিংবা উইকেটের চারপাশে এবির মতোই ৩৬০ ডিগ্রি ব্যাটিং...। তাঁকে পরামর্শ-টরামর্শ দিয়ে পাশে আছেন এবি ডি ভিলিয়ার্স নিজেই! তা ডি ভিলিয়ার্স যে এখনও ব্রেভিসকে কেনার ব্যাপারে তাঁর সাবেক দল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে পরামর্শ দেননি, সেটা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না! সদ্য শেষ হওয়া যুব বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কার পাওয়া ব্রেভিসের জন্য শুধু বেঙ্গালুরুই নয়, আরও অনেক আগ্রহী দলই পাওয়া যাবে নিলামের টেবিলে।

ঈশান কিষান

আইপিএলের নিলামে সবচেয়ে বেশি দাম যাদের উঠতে পারে, এই আলোচনায় শেবাগ থেকে শুরু করে চেন্নাইয়ের সাবেক তারকা সুব্রমনিয়াম বদ্রিনাথ, সবার তালিকাতেই আইয়ারের পাশাপাশি আরেক জনের নাম রয়েছে—মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের সাবেক উইকেটকিপার–ব্যাটসম্যান ঈশান কিষান। আরেক সাবেক ক্রিকেটার হরভজন সিং তো বলেই দিয়েছেন কিষানের সম্ভাব্য দলের নাম। ভারতের ইতিহাসের অন্যতম সফল এই স্পিনারের চোখে কিষানকে পাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগবে কোহলির বেঙ্গালুরু।

কিছুদিন আগে হার্শা ভোগলেও জানিয়েছিলেন, বাঁহাতি টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান, উইকেটকিপার, বয়সে তরুণ, ধুমধাড়াক্কা ব্যাটিং করতে পারেন—এসব বৈশিষ্ট্যের কারণেই কিষানের প্রতি দলগুলোর আগ্রহ থাকবে।

জেসন হোল্ডার

কিছুদিন আগে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছিল, বিদেশি অলরাউন্ডারের খোঁজে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু জেসন হোল্ডারের পেছনে বড় অর্থ খরচ করতে পারে। করবে না-ই বা কেন! ৩০ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারের কাছ থেকে নিয়মিত ৪ ওভার বোলিংয়ের পাশাপাশি লোয়ার অর্ডারে কার্যকরী ব্যাটিংও পাওয়া যায়। হোল্ডারের নেতৃত্বগুণ নিয়েও নতুন করে কিছু বলার নেই, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ ওয়ানডে অধিনায়ক হওয়ার কীর্তি তাঁর। সিপিএলে নেতৃত্ব দিয়েছেন বার্বাডোজ ট্রাইডেন্টসকেও। আকাশ চোপড়ার মতে, হোল্ডার এ আসরে কোটিপতিও হয়ে যেতে পারেন!

মিচেল মার্শ

ব্যাটিং অর্ডারের তিন থেকে শুরু করে সাত-আট নম্বর পর্যন্ত যেকোনো জায়গায় ব্যাটিং করতে পারার ক্ষমতা মিচেল মার্শকে বাকিদের থেকে আলাদা করে রাখে। এর পাশাপাশি তাঁর মিডিয়াম পেসও বেশ কার্যকরী। এর আগে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ, ডেকান চার্জার্স, পুনে ওয়ারিয়র্স ইন্ডিয়া, রাইজিং পুনে সুপারজায়ান্টসের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোতে খেলার কারণে আইপিএল অভিজ্ঞতাও ভালোই আছে মার্শ পরিবারের ছোটজনের।

এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার শিরোপা জয়ের পথে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক মার্শ। ফাইনালে তাঁর ৫০ বলে ৭৭ রানের ইনিংসই বলতে গেলে অস্ট্রেলিয়ার শিরোপার ভিত গড়ে দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সদ্য শেষ হওয়া বিগ ব্যাশ লিগেও পার্থ স্কর্চার্সকে শিরোপা জেতানোর পেছনে ভূমিকা রেখেছেন মার্শ।

ডেভিড ওয়ার্নার

আইপিএল ইতিহাসের অন্যতম সফল বিদেশি ডেভিড ওয়ার্নারের ওপর এবার সানরাইজার্স হায়দরাবাদ ভরসা রাখেনি। হায়দরাবাদে অনাদরে পড়ে থাকা এই রত্নকে নিয়ে নিলামের টেবিলে এবার বাকি দলগুলো যে ধুন্ধুমার কাণ্ড বাঁধিয়ে ফেলবে, সেটা নিঃসংশয়ে বলে দেওয়া যায়। সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার মোহাম্মদ কাইফের মতে, বিদেশিদের মধ্যে এবার ওয়ার্নারের দামই সবচেয়ে বেশি উঠবে।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ২৮৯ রান করে ওয়ার্নার আগেই বুঝিয়ে দিয়েছেন, আইপিএলে আবারও সুযোগ পেলে কী কী করার সামর্থ্য আছে তাঁর! সঙ্গে অধিনায়ক হিসেবে ওয়ার্নারের অভিজ্ঞতাও বাড়তি আকর্ষণের কারণ। হায়দরাবাদ তাঁদের ইতিহাসের একমাত্র আইপিএল শিরোপা জিতেছিল ওয়ার্নারের অধিনায়কত্বেই।

আভেশ খান

দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে বল হাতে গত মৌসুমে তিনি সবাইকে চমকে দিয়েছেন। কিন্তু সেই আভেশ খানকেই এবার ধরে রাখেনি দিল্লি। গতবার ১৮.৭৫ গড়ে ১৬ ম্যাচে ২৪ উইকেট নেওয়া এই বোলারকে নিয়ে নিলামের টেবিলে ঝড় উঠবে, বলে রেখেছেন স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিন।

নিজের ইউটিউব চ্যানেলে অশ্বিন বলেছেন, ‘আভেশ খানকে নিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো নিলামের টেবিলে এবার লড়াই করবে নিশ্চিত। ২০১০ সালের নিলামে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর মালিক বিজয় মালিয়া যেমন আমার জন্য লড়াই করেছিলেন চেন্নাই সুপার কিংসের সঙ্গে, তেমন কিছুই হবে এবার আভেশকে নিয়ে।’ দিল্লির কোচ রিকি পন্টিংও জানিয়েছেন, আসছে আইপিএলে রুতুরাজ গায়কোয়াড় আর পৃথ্বী শ এর পাশাপাশি আলো ছড়াবেন এই পেসার।

হার্শাল প্যাটেল

আভেশের মতো অবস্থা হার্শালেরও। গতবাল বল হাতে আলো ছড়ালেও তাঁর দল বেঙ্গালুরু রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স হার্শালের ওপর ভরসা রাখেনি। ২০১২ সালে হার্শালের অভিষেক হলেও গত মৌসুমেই ভালোভাবে সবার নজরে আসেন এই পেসার। ৩২ উইকেট নিয়ে আইপিএলের এক মৌসুমে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার রেকর্ডেও ডোয়াইন ব্রাভোর পাশে বসেছেন হার্শাল। যে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর নজর থাকবে ঘরোয়া বোলার নিয়ে শক্তি বাড়ানোর দিকে, হার্শাল তাদের জন্য উপযুক্ত।

প্যাট কামিন্স

বল হাতে কামিন্স কী কী করতে পারেন, সেটা কারও অজানা নয়। গত চার মাসে কামিন্স চমকে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়কত্ব করেও। আর এই অধুনাপ্রকাশিত নেতৃত্বগুণই এবার আইপিএলে তাঁকে কোটিপতি বানাতে সাহায্য করতে পারে। কলকাতা নাইট রাইডার্সের সাবেক এই পেসার গত নিলামে বাগিয়েছিলেন সাড়ে ১৫ কোটি রুপি। এবার যে তার ব্যতিক্রম কিছু হবে—এমন কিছু বলার মতো মানুষ খুব বেশি একটা খুঁজে পাওয়া যাবে না। সাত-আট নম্বরে নেমে ব্যাট হাতে দ্রুত রান তোলার সামর্থ্যের কথাও গত আইপিএলেই জানান দিয়েছেন কামিন্স।

শার্দুল ঠাকুর

এক বছর ধরে হার্দিক পান্ডিয়ার জায়গায় পেস বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে শার্দুল ঠাকুরকে খেলানোর ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যাচ্ছে ভারত। সে পরীক্ষায় শার্দুল বেশ ভালোই সফল। সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচ খেলেছেন। কয়েক দিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আট নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ফিফটি করে জানিয়ে দিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বল হাতে উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাট হাতেও রান করতে পারেন তিনি। গত আসরে চেন্নাইকে চ্যাম্পিয়ন করার পেছনে বল হাতে দলটার হয়ে সবচেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছিলেন শার্দুল।

মেরাজুল কনক

আমি মেরাজুল ইসলাম, একজন বাংলাদেশী ব্লগার। ব্লগিং এর পাশাপাশি আমি ওয়েবসাইট ডিজাইন, কন্টেন্ট রাইটিং, কাস্টমাইজ সহ ওয়েব রিলেটেড অনেক কাজ করি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন